রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:২০ এ.এম, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
মানবসত্তার বহুমাত্রিকতা বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) এক স্বতন্ত্র ও অনন্য শিল্পসত্তা। মানবসত্তার বহুমাত্রিকতা
  • সাহিত্য
  • abc editor - ২৩ সেপ্টেম্বর, ০২:৪৭ এ.এম ৩৬

বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) এক স্বতন্ত্র ও অনন্য শিল্পসত্তা। মানব জীবনের বহুবিচিত্র রূপ, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং অন্তর্লোকের সূক্ষ্ম অনুভব তাঁর গল্পসৃষ্টির প্রধান অনুপ্রেরণা। জীবনকে তিনি দেখেছেন গভীর মমত্ববোধ ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের আলোকে; ফলে তাঁর গল্পে প্রতিফলিত হয়েছে মানুষের আশা-নিরাশা, প্রেম-ঘৃণা, বিশ্বাস-সংশয়, আত্মত্যাগ ও আত্মসংঘাতের বিচিত্র সমাবেশ। সমাজ ও জীবনের বহমান স্রোতের মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি মানবসত্তার অন্তর্গত সত্য অনুসন্ধানে ব্রতী হয়েছেন।

বনফুলের ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো চরিত্রনির্ভরতা এবং মানবমনের জটিলতার সূক্ষ্ম উপস্থাপন। তাঁর গল্পে মানুষ কেবল সামাজিক সত্তা নয়, বরং এক রহস্যময় মনস্তাত্ত্বিক অস্তিত্বÑ যার অনুভূতি, দুর্বলতা ও শক্তি মিলেমিশে গড়ে তোলে জীবনের বহুরৈখিক বাস্তবতা। এই মানবকেন্দ্রিক শিল্পদৃষ্টিই বনফুলকে তাঁর সমসাময়িকদের থেকে স্বতন্ত্র করেছে। তাই বনফুলের ছোটগল্পসমূহ একদিকে যেমন জীবনের বাস্তব দলিল, অন্যদিকে তেমনি মানবচেতনার গভীর অন্বেষণের শিল্পরূপ।

এই প্রবন্ধে বনফুলের নির্বাচিত কয়েকটি ছোটগল্পের আলোকে তাঁর মানব বৈচিত্র্যচেতনা ও মানবমনের জটিলতা বিশ্লেষণের প্রয়াস নেওয়া হয়েছে, যেখানে গল্পের চরিত্র, ঘটনা ও অন্তর্নিহিত জীবনদর্শনের মাধ্যমে তাঁর শিল্পভাবনার মৌলিক স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টা করা হবে।

জীবন নিয়ে বনফুলের নানা কৌতূহল নানা জিজ্ঞাসা গল্পের বিচিত্র রূপাধারে নানামুখী আবেদন নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। তারও মধ্যে এক বিশেষ ধরনের গল্পে শিল্পীর মানুষ দেখা চোখের চমকপ্রদ অভিজ্ঞান একের পর এক উজ্জ্বল হয়ে দেখা গিয়েছে। তার গল্পের চরিত্রগুলো বহু বিচিত্র চিত্রশালায় পরিপূর্ণ একথা সত্য কেননা তার গল্পে মানুষের ব্যক্তিরূপের অনন্যতা ও অসামান্যতা গাঢ় উজ্জ্বল বর্ণে প্রতিফলিত হয়েছে। বনফুলের গল্পে সে এক বিশেষ ধরনের সৃষ্টি। লেখক নিজে বলেছিলেন, ‘জীবনের নানা বিচিত্র আবেষ্টনীতে পড়ে নানারকম মানুষ দেখেছি আমি। মানবজীবনের বৈচিত্র্যই আমাকে সবচেয়ে বেশি ইন্সপায়ার করে। অন্যত্র আরও সুস্পষ্ট করে বলেছেন, ‘মানুষই আমার বিষয় এবং প্রেরণা। আমার লেখায় একটা মেসেজ বা বলবার কথা আছে।


সেটা হলো মানুষ বহু বিচিত্র,’ আর মানুষের এই বিচত্রতাকে তার গল্পে-উপস্থাপন করেছেন তাদের চরিত্রের মধ্য দিয়ে। কেননা তার প্রত্যেকটি গল্পই বহু বিচিত্র চরিত্রের এক চিত্রশালা। তিনি বলেছেন, ‘মানুষকে অনুসরণ করে আমি আমার লেখার নিত্যনতুন বিষয় ও ভঙ্গি আবিষ্কার করেছি।’ বনফুলের প্রত্যেকটি গল্পের চরিত্র উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। বনফুল কিন্তু জীবনকে কখনো বিচ্ছিন্ন কোনো খন্ডতার মধ্যেই ধরে দেখেননি, জীবনের সামগ্রিক চরিত্র অন্বেষণই ছিল ডার শিল্প সৃষ্টির মুখ্য প্রেরণা। তাই অনন্ত জীবন প্রবাহের রহস্য সন্ধানে কেবল মানুষের প্রেমের বিকৃতি বা অনিয়ন্ত্রিত চধংংরড়হ-ই তার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে থাকেনি, জীবনের পরিকাঠামোয় প্রেমের পূর্ণ প্রতিষ্ঠাও তিনি দেখেছিলেন।


অধিকন্তু ভালোবাসার সবচেয়ে পূর্ণতা প্রেমকে অতিক্রম করার আনন্দে-এ সত্যও অনুভব করেছিলেন বনফুল পাঠকের মৃত্যু গল্পটিতে বনফুল বিচিত্র মানবমনের ও চরিত্রের চিত্রই তুলে ধরেছেন। পাঠকের মৃত্যু গল্পে পাঠক তথা গল্পকথক এবং আরেকজন লোক ট্রেনের জন্য আসানসোল স্টেশনে অপেক্ষা করছেন। তারা দুজনই বাঙালি। স্টেশনে টিনের ছাদের নিচে দুঃসহ গ্রীষ্মের গরমে তারা অপেক্ষা করছেন। পাঠক লোকটার হাতে একটা বই দেখেন। এটা বেশ মোটা একটা উপন্যাস। পাঠক লোকটির কাছ থেকে বইটি চেয়ে নেন এবং পড়া শুরু করে দেন। বইয়ের মালিক বারবার পাঠকের দিকে তাকায় আর সময় দেখে।


বই পড়তে পড়তে দুই ঘণ্টা কেটে গেছে, এমন বই পাঠক আর আগে কখনো পড়েনি। ভদ্রলোক পাঠককে বলে যে, ট্রেন আসতে আর দেরি নেই। পাঠক তখন পড়ায় মগ্ন। তিনি হাতঘড়ি দেখে লোকটাকে বলেন যে, এখনো ঘণ্টা খানেক সময় আছে। বইটা তখনো প্রায় অর্ধেকের বেশি পড়া বাকি। তাই পাঠক আর কোনো কথা না বলে আবার পড়তে থাকেন। তারপর ট্রেন এসে গেল, বইয়ের তখনো অনেক পড়া বাকি। বইয়ের মালিক পাঠককে ট্রেন আমার কথা জানালে পাঠক বলে পরের ট্রেনে যাবে, তবু বইটি পড়া শেষ করবে। পাঠক বই পড়তে পড়তে শেষ পর্যন্ত দেখে বইয়ের শেষে কিছু পাতা নেই।


পাঠকের তখন খুব রাগ হয় পাঠক রেগে গিয়ে বইয়ের মালিককে বলে বইয়ের শেষের পাতাগুলো নেই তা আগে বলবেন না। ভদ্রলোকের পাঠকের ওপর রাগ হয় বটে কিন্তু কোনো উত্তর দেয় না। দীর্ঘ দশ বছর পরে পাঠক ভাগ্নির বাড়ি যায়, কিন্তু বাড়িতে পাঠকের দীর্ঘদিনের কাক্সিক্ষত সেই বইটি দেখে সেদিন আর পাঠক ফিরে না। দশ বছর আগে স্টেশনে যে বইটি সে শেষ করতে পারেনি, সে এখন সে বইটি পেয়ে পড়া শুরু করে। কয়েক পাতা পড়ার পর কেমন যেন একটা খটকা লাগে। এখন কেমন যেন গোলমাল লাগছে। তারপরও কিছুটা জোর করে পড়তে থাকে।


কিছুক্ষণ পর তার মনে হলো না আর গড়া চলে না। কোনোভাবেই এমন বিশ্রী বই পড়া চলে না। বই মূলত ঠিকই আছে। কিন্তু ঠিক নেই পাঠকের মন। কেননা দশ বছর আগে যে উৎসুক মন ছিল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আজ আর সে মন নেই। দশ বছর আগের পাঠক যার আজকের সম্পূর্ণ ভিন্ন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনের পরিবর্তন ঘটে, ‘যা ঘটেছিল পাঠকেরও। তার মনের পরিবর্তনের ফলে দশ বছর পূর্বে যে বইটি তার কাছে কাক্সিক্ষত মনে হয়ে ছিল  তা এখন রাবিশ মনে হয়েছে। তাই বলা যায়, সময় মানুষের সবকিছুকে খেয়ে ফেলে আবার সময় নতুন করে কিছু সৃষ্টি করে। অমোঘ সময়ের সক্রিয়তা আমাদের জীবনে অনস্বীকার্য।

বনফুল অসংখ্য গল্প লিখেছেন। তন্মধ্যে ৫৮০টির সন্ধান মিলে এর মধ্যে বেশকিছু কিশোর কাহিনীও আছে, তবুও অধিকাংশই প্রত্যক্ষ জীবনের নানা চরিত্র ও রূপচিত্র নিয়ে। তার অসংখ্য গল্পের মধ্যে নিমগাছ-গল্পটি অন্যতম। নিমগাছ গল্পে বলা হয়েছে যে, নিমগাছের যেমন রয়েছে উপকারিতা তেমনি তার ভিতরে জমে রয়েছে অনেক কষ্ট। কেউ তার কষ্টের কথা ভাবে না শুধু কীভাবে তার থেকে উপকার পাওয়া যায় তা নিয়ে সবাই বাস্ত থাকে। কিন্তু কেউ নিমগাছের যতœ করে না। অযতœ ও অবহেলায় বেড়ে ওঠে নিমগাছের চারা। আবর্জনার স্তূপের মধ্যে বেড়ে ওঠে এবং আবর্জনায় দাঁড়িয়ে থাকে।


কেবল কবিই মুগ্ধ দৃষ্টিতে নিমগাছের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে নিমগাছের ছাল তোলে না, পাতা ছিঁড়ে না, ডালও ভাঙে না। শুধু মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে আর বলে, বাঃ কি সুন্দর পাতাগুলো, কি রূপ। থোকা থোকা ফুলেরই বা কি বাহার। এক ঝাঁক নক্ষত্র নেমে এসেছে যেন নীল আকাশ থেকে সবুজ সায়রে। কবির মুখে নিমগাছ তার প্রশংসা শুনে নিমগাছের ইচ্ছে হলো তার সঙ্গে চলে যেতে। কিন্তু নিমগাছ যেতে পারল না। কারণ মাটির ভিতরে তার শিকড় অনেক দূরে চলে গেছে। তার পক্ষে এখন আর সে শিকড় উঠিয়ে যাওয়া সম্ভব না। বাড়ির পিছনে আবর্জনার স্তূপের মধ্যেই সে দাঁড়িয়ে রইল।


নিমগাছটাকে কেউ কাটে না, আবার কেউ তার যতœও করে না। তাকে  ওই ময়লা-আবর্জনার মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সে কেবল মানুষের উপকারের জন্যই সৃষ্টি বাড়ির গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মী বউটা যেমন সংসারের বন্ধন ছিন্ন করে সংসার থেকে যেতে পারে না নিমগাছটার সেই একই দশা। ময়লা-আবর্জনা থেকে চলে যেতে পারে না।

মানুষের মন গল্পে জীবনসত্যের দিকটি শিল্প সুষমায় রঞ্জিত হয়েছে।

নরেশ ও পরেশ সহোদর ভাই। আকৃতি ও প্রকৃতি উভয় দিক দিয়েই এদের মিলের অপেক্ষা অমিলই বেশি। দুজনই গৌড়া। একজন গোড়া বৈজ্ঞানিক, আর একজন গোঁড়া বৈষ্ণব। উভয়েই এমএ পাস। নরেশ কেমিস্ট্রিতে আর পরেশ সংস্কৃতে। উভয়ের জীবন দুই ভিন্ন স্রোতে প্রবাহিত। কিন্তু এক জায়গায় দুজনের অসম্ভব মিল, ভ্রাতুষ্পুত্র পল্টু দুজনেরই প্রাণাধিক প্রিয়। পল্টুর গুরুতর অসুখ-টাইফয়েড। বৈজ্ঞানিক নরেশ ছুটলেন অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তারের কাছে এবং ধার্মিক পরেশ দারস্থ হলেন কবিরাজের।


জ্যোতিষ, তারকেশ্বরের দৈব ঔষধ সবই চেষ্টা করা হলো, ফল শূন্য। বৈজ্ঞানিকের শেষ অস্ত্র ইনজেকশনও বিফল। পল্টুর শেষ অবস্থায় উভয়েই জ্ঞানবিশ্বাস হারিয়ে অসহায়। সেই চরম অগ্নিপরীক্ষায় দেখা গেল, মৃত্যুর হাত থেকে স্নেহের ধনকে আঁকড়ে রাখার জন্য বৈজ্ঞানিক নরেশ আশ্রয় খুঁজছেন বাবা তারকেশ্বরের চরণামৃতে এবং ধার্মিক পরেশ ভরসা করছেন অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসাতেই। উভয়ের প্রত্যয় বিপর্যয়ে সার্থক ছোটগল্পটিতে আয়রনি ব্যঙ্গের প্রান্তে সমুপস্থিত। এ গল্পে মানবমনের এক বিশেষ দিক উন্মোচন করেছেন বনফুল। মানবমনের এমন জটিলতা তার আকর্ষণ।

অর্জুন মন্ডল গল্পটির কথা সম্পূর্ণভাবে চরিত্রনির্ভর। এ গল্পে প্রত্যয়বাদী বলিষ্ঠ এক মানবিক ব্যক্তিত্বের অনমিত উজ্জ্বল রূপ রচনা করা হয়েছে। এ যেন বনফুলের জীবন-বাসনার এক জ্বলন্ত ছবি। গল্পবক্তার আবাল্য পরিচিত এ অর্জুন মন্ডল বা অর্জুন কাকা ছিলেন এক অসাধারণ চরিত্রের বাতিক্রমী মানুষ। অর্জুন মন্ডল গল্পে অর্জুন মন্ডল দরিদ্র জেলে। বিদ্বানের প্রতি দুর্ধর্ষ জমিদারদের শ্রদ্ধা দেখে সে বুঝতে পারে বিদ্যাই সব, বিদ্যাই আসল। বিদ্যার রয়েছে বিশেষ গুণ। তাই সে পড়াশোনা করতে চায়। ডাক্তার বাবুর সাহায্যে সে পড়াশোনা শুরু করে।


ডাক্তারের ছেলেদের সঙ্গে তাদের মাস্টার মশাইয়ের কাছেই পাঠ শুরু করে। সে তার মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে মাত্র দেড় বছরের মধ্যেই অর্জুন মন্ডল পাঠে অনেক দূর এগিয়ে যায়। সে খুব ভালো ইংরেজিও শিখে ফেলে তার ইংরেজি বলা দেখে ইংরেজি সাহেব অবাক হয়ে যান এবং ডাক্তার বাবুকে বলেন, অর্জুনকে কম্পাউন্ডারি পড়াবার ব্যবস্থা করে দিতে। অর্জুনের কম্পাউন্ডারি পড়া শেষ হলে ইংরেজি সাহেব তাকে স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দিবে। ডাক্তারের মুখে এসব কথা শুনে অর্জুন অবাক হয়ে যায়। একাগ্রচিত্তে সে যে পথে চলছিল আর ভাবছিল যে এ কাজে হয়তোবা তার আর স্বাধীনতা থাকবে না। জন্মগতভাবেই মানুষ স্বাধীন থাকতে ভালোবাসে। যখন তার স্বাধীনতা কেউ বাধা দেয় তখন সে তা মেনে নিতে পারে না। অর্জুন মন্ডলের বেলায়ও তাই হয়েছে।


সুতরাং ভাবা ভুল হবে না যে, চোখে দেখা এক বলিষ্ঠ দৃঢ়পণ ব্যক্তিত্বের মূর্তরূপ অর্জুন মন্ডলের চরিত্রবিন্যাসে উদ্ধার করতে গল্পের চাহিদাতেই তাকে ‘ম্যাগনিফায়েড’ করে তোলা হয়েছে। সম্ভবত কেবল অর্জুন মন্ডলের ট্র্যাজেডিটা শিল্পী বনফুলের কল্পনা। একই সঙ্গে জানতে ইচ্ছে করে এর পিছনে তার নিজের অভিজ্ঞতার আক্ষেপও কি লুকিয়ে নেই। নীতিনিষ্ঠ বনফুল স্বভাবে শুদ্ধ-বলিষ্ঠ জীবনের একান্ত পূজারি; তাই পরিচিত কালের ভগ্ন অবক্ষয়ী পটভূমিকায় কেবল হেরে যায় তার অর্জুন মন্ডলেরা। আসলে নিজের গড়া বাক্সটির মতোই অর্জুন মন্ডলও যে এ সমাজে বেমানান তাই কি শিল্পী বুঝাতে চেয়েছেন এ গল্পে?

বুধনী গল্পে প্রতিফলিত হতে দেখা যায় মানবপ্রকৃতির এমন সব চিত্র যা জীবনের আপাত ক্ষেত্রে অনুদঘাটিতই রয়ে যায়। বনফুলের বুধনী গল্পের বিন্টু এমনই এক জটিল ও বিচিত্র মানব চরিত্র। অরণ্যচারী শিকড়সন্ধানী বিন্টু ভালোবেসে জীবনের পরীক্ষা দিয়ে বিয়ে করেছিল বুধনীকে। বিয়ের পর সে এক দন্ডের জন্যও ছাড়েনি বুধনীকে। কিছুদিন পর বুধনীর কোলজুড়ে আসে এক সন্তান। বুধনী মাতৃত্বলোকে উত্তীর্ণ হয়। বিন্টু দেখল বুধনীর ভালোবাসার সবটুকু দখল করে আছে সন্তান। তাই বিন্টু হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে হত্যা করে নিজের শিশু পুত্রকে। বিচারে তার ফাঁসি হয়।


অধিকারবোধের প্রেম ও ভালোবাসার টানে সে নির্দ্বিধায় হত্যা করে সন্তানকে। এতে তার গ্লানি বা অন্যায়বোধ নেই; বরং সে মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত শুধু বুধনী, বুধনী বুধনী, বলে চিৎকার করেছিল। ভগবানের নামটা পর্যন্ত করেনি। বিন্টু হলো একমাত্র প্রেমিক সত্তা। প্রকৃতির সহজ নিয়ম সে মেনে নিতে পারেনি। এমনকি আপন দেহজ-আত্মজ সন্তানকেও নয়। মানবমনের এমন জটিল ও বিচিত্র রূপ বুধনী গল্পে অনন্যতা পেয়েছে।

গণেশ জননী গল্পে পশুর প্রতি মানুষের আপত স্নেহ মমতার বিষয়টি পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। নিঃসন্তান দম্পতির সন্তানের স্থান অধিকার করে হাতির বাচ্চাটি। হাতির জন্য তারা ঘরের দরজা কেটে বড় করে, একশ বিঘা জমির খোরাক সব হাতির পিছনেই যায়। তাদের সমস্তটা জুড়ে হাতিটি বিরাজ করে। নিঃসন্তান দম্পতির একটি পশুর প্রতি এই যে অপত্য স্নেহ তা মানবমনের এক দুর্জেয় রহস্যই বটে।

তাজমহল গল্পে সম্রাট ও ফকিরের প্রেমের সমমূল্যতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ফকির শা-জাহান তার আধখানা মুখ পড়ে যাওয়া স্ত্রীকে ঝুড়িতে বয়ে নিয়ে গল্পকথক ডাক্তারের কাছে যায়। ‘ক্যাংক্রাম অরিসে’ আক্রান্ত দুর্গন্ধযুক্ত স্ত্রীকে সে অক্লান্ত সেবা করেও বাঁচাতে পারে না। অসুস্থ স্ত্রীর সেবা করেও যখন দরিদ্র-বৃদ্ধ শা-জাহান তাকে বাঁচাতে পারেনি তখন ভাঙা হাট আর কাদা দিয়ে সমাধি নির্মাণ করে ফকির তার প্রেমের স্মারককে করে তুলেছে অবিনশ্বর এবং সেই আগ্রার মাটিতেই সেখানে সম্রাট শাজাহানের প্রেমের শাশ্বত মূর্তি বুকে ধরে রয়েছে ‘তাজমহল’ এর মতো কীর্তিনাশা ইমারত। সম্রাট শা-জাহানের প্রেমাকৃর্তি সর্বজনবিদিত হলেও ফকিরের প্রেমনিষ্ঠা তার সমমূল্যের দাবি রাখে।

বনফুল প্রকৃতই ছিলেন সুদ্ধ জীবন শিল্পী, তার গল্পের বিচিত্র চরিত্রকে তিনি বৈচিত্র্য দিয়ে আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। কয়েকটি মাত্র রেখায় যেন ফুটিয়ে তুলেছেন মানবমনের বিচিত্র ভাব-অনুভাব, বিচিত্র রূপচিত্রকে, বনফুলের আরও বহু আলোচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ গল্প রয়েছে। দুই তীব, স্বাধীনতার জন্ম, জৈবিক নিয়ম, পাখী প্রভৃতি। এসব গল্পের চরিত্র ও বৈচিত্রাকে এক অর্থ চিত্রশালায় উপস্থাপন করেছেন। এসব গল্প কেবল বনফুলের পরিশুদ্ধকামী জীবন জীবন বাসনার উন্মোচনই নয়, ভগ্ন প্রত্যয় জীবন অভিজ্ঞতার বিক্ষেপে প্রত্যয়ী শিল্পীচেতনার যেন এক নিভৃত-আপাতনির্লিপ্ত প্রক্ষেপণ। ‘বহু বিচিত্র চরিত্রের এক চিত্রশাল বনফুলের গল্প।’ একথা যুক্তিযুক্ত। কেননা বনফুলের গল্প বিশেষভাবে চমকপ্রদ রূপকলার গুণেই আকর্ষণীয়, এমন ধারণা প্রচলিত।

বনফুলের ছোটগল্পে মানববৈচিত্র্য, মানবমনের জটিলতা সার্থক রূপলাত করেছে। কেননা কথাশিল্পী বনফুল বিশেষভাবেই ছিলেন মানবজীবদ সন্ধানী। জীবন নিয়ে নানা কৌতূহল, নানা জিজ্ঞাসা গল্পের বিচিত্র রূপাধারে নানামুখী আবেদন নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। সেই সঙ্গে মানবমনের জটিলতা, আর্তি, আবেদন তার গল্পে বিভিন্ন রূপাধারে প্রকাশ পেয়েছে। কেননা এ অভিজ্ঞতাবান জীবনশিল্পীর মূল আকর্ষণ ছিল মানবমনের জটিলতা। তাই এত বিচিত্র মানুষের কথা তিনি গল্পে বলতে পেরেছেন।


  • শেয়ার করুন:
এই বিভাগের আরও খবর
abc
২৩ সেপ্টেম্বর, ০২:৪৪ এ.এম
abc
২৩ সেপ্টেম্বর, ০২:১৪ এ.এম
পাঠকের মন্তব্য
  • এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
মন্তব্য করুন
সর্বশেষ খবর
Make Your Business Digital
10%
OFF
Domain only
1650 TK
5GB NVME Hosting
2500 TK
High Speed Website with High Security
Call : 01631101031
SPACE FOR ADD
200 x 350
SPACE FOR ADD
200 x 350