রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:২০ এ.এম, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি: রাষ্ট্র বাঁচে প্রজ্ঞাপনে, জনগণ হাঁপায় রান্নাঘরে চিররঞ্জন সরকার জ্বালানির দাম বৃদ্ধি: রাষ্ট্র বাঁচে প্রজ্ঞাপনে, জনগণ হাঁপায় রান্নাঘরে
  • মতামত
  • abc editor - ২৩ সেপ্টেম্বর, ০৩:১৪ এ.এম ৩২

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো এখন আর কোনো খবর নয়, যেন এক মৌসুমি উৎসব। পার্থক্য শুধু এটুকু—অন্য উৎসবে মানুষ আনন্দে অংশ নেয়, আর তেলের দাম বাড়ার উৎসবে মানুষ অংশ নেয় ভবিষ্যতের খরচের হিসাব কষতে কষতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

সরকার একলাফে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা করেছে। পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা। কেরোসিনও পিছিয়ে নেই, ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা। অর্থাৎ প্রায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় ২০ টাকা করে বেড়েছে।

কেন? এই ‘কেন’ প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের ব্যাখ্যা আছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ বেড়েছে, মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও সরকার জনস্বার্থে এতদিন দেশের বাজারে দাম বাড়ায়নি।

শুনতে বেশ মহৎ। সরকার নাকি পাঁচ মাস ধরে জনগণের স্বার্থে তেলের দাম বাড়ায়নি। অর্থাৎ এতদিন জনগণকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। আজ থেকে সেই মহান দায়িত্বের মেয়াদ শেষ। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন হলো—আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশে দাম বাড়বে, এটি আমরা বুঝি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে কতটা বেড়েছে, তার সঙ্গে দেশের বাজারে কতটা বাড়ানো যৌক্তিক, সেটিও কি জনগণ জানতে পারে?

কারণ বাজার অর্থনীতির সবচেয়ে মজার খেলাটা এখানেই। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশে দাম বাড়ে। এক লাফে ২০ টাকা!


এ যেন তেলের দাম নয়, উচ্চতর গণিতের কোনো নতুন সূত্র। এক লিটার কিনবেন, সঙ্গে মূল্যস্ফীতির একটি প্যাকেজ বিনামূল্যে পাবেন। দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় ধাক্কা অবশ্য ডিজেল গাড়ির মালিকের ওপর গিয়ে পড়ে না। ধাক্কাটা পড়ে সেই মানুষটির ওপর, যার নিজের কোনো গাড়ি নেই। যে বাসে ওঠে, ট্রাকে আসা চাল-ডাল কেনে, সেচের পানিতে উৎপাদিত সবজি কেনে, পণ্য পরিবহনের খরচ দেয়, বাজারে গিয়ে মাছ-মাংসের দাম শুনে নিঃশব্দে হাঁটা দেয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, উৎপাদন খরচ বাড়বে, পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে। তারপর একে একে বাজারের প্রায় প্রতিটি পণ্যের গায়ে নতুন দাম লেখা হবে।

তখন সরকার হয়তো বলবে, ‘তেলের দাম তো মাত্র ২০ টাকা বেড়েছে।’ হ্যাঁ, মাত্র ২০ টাকা। কিন্তু বাজারের দোকানদার তো শুধু ২০ টাকা বাড়াবে না। বাসভাড়া বাড়বে, ট্রাকভাড়া বাড়বে, কৃষকের সেচ খরচ বাড়বে, কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়বে, রেস্টুরেন্টের খাবারের দাম বাড়বে। এমনকি যে পণ্যটি সাইকেলে করে আপনার বাসার সামনে আসে, তার দামও কোনো এক অদৃশ্য অর্থনৈতিক সূত্রে বেড়ে যেতে পারে।

অর্থনীতির এই আশ্চর্য জগতে তেলের দাম ২০ টাকা বাড়ে, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়ে তার চেয়ে অনেক বেশি। এর মধ্যে আরেকটি প্রশ্ন আরও কষ্টদায়ক। দেশে গ্যাস নেই। বিদ্যুতের পরিস্থিতিও এমন নয় যে নাগরিকরা বিদ্যুৎ নিয়ে কবিতা লিখবেন। শিল্পকারখানা গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করে, বাসাবাড়িতে মানুষ লোডশেডিংয়ের সময়সূচি বোঝার চেষ্টা করে। এর মধ্যেই জ্বালানি তেলের দামও বাড়ল।


অর্থাৎ শক্তির তিন দরজা দিয়েই চাপ।

গ্যাস বলছে, ‘আমি আছি এবং নেই।’

বিদ্যুৎ বলছে, ‘আমি আছি, তবে সবসময় নই।’

তেল বলছে, ‘আমি আছি, কিন্তু দাম দিয়ে আমাকে ভালোবাসতে হবে।’

তারপরও আমাদের বলা হবে, ‘সরকারের দক্ষ নেতৃত্বে’ দেশ এগিয়ে চলছে। কীভাবে এগিয়ে চলছে, সেই প্রশ্নটা কেউ করলে হয়তো উত্তর আসবে, ‘ডিজেল দিয়ে।’ কিন্তু ডিজেলের দামই যদি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে যেতে থাকে, তাহলে সেই উন্নয়নের চাকা ঘুরে শেষ পর্যন্ত কার ঘরে গিয়ে থামবে?


এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানোর বিষয়টি। বেতন বাড়ানো হয়েছে, সেটি নিয়ে আপত্তির জায়গা আলাদা। রাষ্ট্রের কর্মীদের ন্যায্য বেতন দরকার। কিন্তু একই সময়ে যখন বিপুলসংখ্যক মানুষের আয় একই হারে বাড়ছে না, তখন বেতন বৃদ্ধির অর্থনৈতিক প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।


এদিকে সরকার বলছে, বিপিসির বিপুল লোকসান হয়েছে। প্রশ্ন হলো, সেই লোকসানের পুরো বোঝা কি ভোক্তার ঘাড়েই চাপাতে হবে? বিপিসির দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা, ক্রয়প্রক্রিয়া, অপারেশনাল ব্যয়, কর কাঠামো, মজুত ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে কি সমানভাবে আলোচনা হবে?


জনগণ তো বিপিসির হিসাবের অংশীদার নয়, কিন্তু লোকসানের বিল এলে তাদেরই পকেট খুলতে হয়। রাষ্ট্র যদি লোকসান করে, জনগণ দেবে। রাষ্ট্র লাভ করলে জনগণ কতটা পায়, সেটি অবশ্য আলাদা প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় কথা, তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সক্ষমতার কথাও থাকতে হবে।

কারণ ‘জনস্বার্থে দাম বাড়ানো হয়নি’ বলা যত সহজ, দাম বাড়ানোর পর সেই জনস্বার্থ রক্ষা করা তত কঠিন। সরকার যদি পাঁচ মাস জনগণের স্বার্থে দাম না বাড়িয়ে থাকে, তাহলে এখন ২০ টাকা বাড়ানোর সঙ্গে জনগণের স্বার্থের কোন হিসাবটি যুক্ত আছে, সেটিও পরিষ্কার করা দরকার।

মানুষ এমনিতেই চাপে আছে। বাজারে চাল-ডাল-তেল-সবজির দাম নিয়ে প্রতিদিন হিসাব করতে হয়। বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, যাতায়াত সব মিলিয়ে সংসারের বাজেট অনেকেরই ইতিমধ্যে কাগজে-কলমে টেকে, বাস্তবে টেকে না।


এখন জ্বালানি তেলের দামও সেই বাজেটের ওপর নতুন পাথর চাপাল। রাষ্ট্রের অর্থনীতি নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। বিপিসির লোকসানও বাস্তব সমস্যা। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও বাস্তব। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হলো, এই বাস্তব সমস্যাগুলোর বোঝা কার ওপর কতটা চাপানো হবে।

কারণ সরকারের বাজেট ঘাটতি কাগজে থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ঘাটতি থাকে রান্নাঘরে। বিপিসির লোকসান হিসাবের খাতায় থাকে, কিন্তু তেলের দাম বাড়ার পর বাড়তি বাসভাড়া দিতে হয় যাত্রীকে। আন্তর্জাতিক বাজারের যুদ্ধ দূরে ঘটে, কিন্তু তার অভিঘাত এসে পড়ে বাংলাদেশের বাজারের থলিতে।


তাই প্রশ্নটা শুধু ‘তেলের দাম কেন বাড়ল’ নয়। প্রশ্ন হলো, একলাফে এতটা কেন?

আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই যদি থাকে, তাহলে স্বচ্ছ হিসাব দিন। মূল্য নির্ধারণের সূত্র প্রকাশ করুন। দাম কমলে কীভাবে দ্রুত কমানো হবে, সেটিও জানান। আর যদি জনগণের ওপর বোঝা চাপাতেই হয়, তাহলে নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও একই সঙ্গে ঘোষণা করুন। কারণ মানুষ আর শুধু প্রজ্ঞাপন শুনতে চায় না। মানুষ জানতে চায়, তার সংসারের হিসাবটা কে রাখবে।


সরকারি অফিসে ফাইল চলবে, বিপিসিতে হিসাব হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উঠবে-নামবে। কিন্তু দিন শেষে বাজারের ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির জন্য হিসাবটি খুব সরল। তেলের দাম ২০ টাকা বেড়েছে। এখন বাকি সবকিছুর দাম কত টাকা বাড়বে?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব শুধু অর্থনীতির নয়, সরকারেরও। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সাফল্য কত কোটি টাকা লোকসান সামলাল, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে, সেই লোকসানের বোঝা সামলাতে গিয়ে কত কোটি মানুষ হাঁপিয়ে উঠল।

চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও কলামনিস্ট।

  • শেয়ার করুন:
এই বিভাগের আরও খবর
পাঠকের মন্তব্য
  • এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
মন্তব্য করুন
সর্বশেষ খবর
Make Your Business Digital
10%
OFF
Domain only
1650 TK
5GB NVME Hosting
2500 TK
High Speed Website with High Security
Call : 01631101031
SPACE FOR ADD
200 x 350
SPACE FOR ADD
200 x 350